ভারতে কেন এত সোনার দাম বাড়ছে?

ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহতম সোনা গ্রহকারী দেশ. যা চীনের পরেই স্থান .প্রচুর সোনা থাকার কারণে অতীতকালে ভারত গোল্ডেন বার্ড নামে পরিচিত ছিল. তবে বর্তমানে ভারতের সোনা পরিমান ও কম নয়.

ভারতীয় পরিবার এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের এত সোনা রয়েছে যে এটি যে কোনও দেশের জন্য  এক চিন্তার বিষয় হতে পারে.

বিশ্ব সোনার কাউন্সিলের মতে, ভারতীয় পরিবার ও সমস্ত ধর্মীয় স্থান মিলিয়ে প্রায় 28000 থেকে 29000 টন স্বর্ণের রিজার্ভ রয়েছে।বিশ্ব সোনার কাউন্সিল অনুমান করেছে যে তিরুবনন্তপুরমের অবস্থিত  শ্রী পদ্মনাভস্বামী মন্দিরের প্রচুর স্বর্ণের রিজার্ভ রয়েছে যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় 165 কোটি টাকা।

বর্তমানে ভারতীয় কেন্দীয় ব্যাংক তথা রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া তে মোট স্বর্ণ সঞ্চিত রয়েছে প্রায় 655 টন ! এর মধ্যে বিগত 8 বছরে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক প্রায় 41 টন স্বর্ণ কিনেছে !

বিশ্ব সোনার কাউন্সিলের করা একটি অনুমান বলছে যে, করোন ভাইরাস এর কারণে বিশ্বব্যাপী তথা দেশব্যাপী  লকডাউন, বিভিন্ন জিনিসের অস্তিতিশীল দাম,ব্যাংকসহ বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্পে স্বল্প হারে সুদ, ডলার পতি ভারতীয় মুদ্রার দাম কমে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ভারতে সোনার চাহিদা মার্চ মাস পর্যন্ত প্রায় 101 টন কমে গিয়েছিল । কিন্তু ২০২০ সালের মার্চ মাসের পর থেকে ভারতীয়রা ইক্যুইটি বিনিয়োগ এবং বাড়ি কেনা ও সঞ্চয় প্রকল্পের বিকল্প খুঁজতে শুরু করে।

২০২০ সালের মার্চ মাসে সোনার দাম ছিল প্রতি দশ গ্রামে 42,200টি টাকা , যা 2020 জুলাই মাসে দশ গ্রামে 52700 টাকায় দাঁড়িয়েছে ।

2020 সালের জুলাইয়ে, চেন্নাইয়ের 24 ক্যারেট সোনার দাম 10 গ্রামে 53,490 টাকায় পৌঁছেছে। এ ছাড়া দেশের প্রায় সব বড় শহরে সোনার গড় দাম 10 গ্রাম প্রতি 50 হাজারের উপরে।

সকল ভারতবাসীর মনে এখন একটাই প্রশ্ন ভারতে বর্তমানে সোনার দাম এত বাড়ছে কেন, যা সাধারণ মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে. কবেই বা এই সোনার দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসবে. বিশেষগ্যের মতে  কবে সোনার দাম কমবে তা সঠিকভাবে বলা সম্ভব না হলেও বর্তমানে সোনার বাজার আগুন হওয়ার মুলে কয়েকটি কারন তুলে ধরেছেন সেগুলো হল –

এক, লোকেরা চায় একটি নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগের জায়গা.বর্তমানে সোনাকে বিনিয়োগের সঠিক জায়গা হিসাবে বেছে নিতে দেখা যাচ্ছে.  দেখা যায় যে সেনসেক্স পড়ে গেলে সোনার দাম বাড়তে শুরু করে। এর কারণ হ’ল লোকেরা শেয়ার বাজারের অনিশ্চয়তার উপর বিশ্বাস রাখে না এবং তারা সোনাকে বিনিয়োগের নিরাপদ পদ্ধতি হিসাবে খুঁজে পায়।সোনায় বিনিয়োগকে সবচেয়ে নিরাপদ হিসাবে বিবেচনা করা হয় এর কারণ হল সোনার দামগুলি খুব বেশি ওঠানামা করে না।

দ্বিতীয়ত রিজার্ভ ব্যাংকের দ্বারা বিভিন্ন সঞ্চয়ী প্রকল্পে সুদের হার হ্রাস করা অথাৎ দেশের বেশিরভাগ সঞ্চয়ী প্রকল্পের সুদের হার যেমন ব্যাংকের সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্ট, কিষান বিকাশ পত্র, পোস্ট অফিসের সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্ট, পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড , সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা, জাতীয় সঞ্চয়পত্র এবং স্থির আমানত ইত্যাদি বর্তমান পরিস্থিতে হ্রাস পেয়েছে। যে কারণে লোকেরা এই সব জায়গা থেকে অর্থ তুলে নিয়ে স্বর্ণ কিনছে,যে কারণে সোনার চাহিদা বাড়ছে এবং চাহিদা বাড়ার কারণে সোনার দামও বাড়ছে ।

তৃতীয়ত, ভারতবর্ষে যে কোন বিবাহ অনুষ্ঠিত হলেই  সোনার প্রয়োজন হয়, সোনা ছাড়া বিবাহ ভাবা অসম্ভব । সুতরাং বিয়ে বাড়িতে প্রচুর সোনার প্রয়োজন হয় . যার ফলে  ব্যাপক হারে সোনার চাহিদা ঘটে এবং সোনার দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা অর্জন কথা করে । আর ডিসেম্বর মাস হল বিবাহের মরসুম, তাই এই মাস শুরু হওয়া আগে লোকেরা স্বর্ণ কিনতে শুরু করে দিয়েছে।

চতুর্থত, সারা বিশ্বব্যাপী COVID-19 এর প্রকোপ। কভিড -১৯ এর কারণে অনেক কিছুর দাম বেড়েছে, যার কারণে লোকেরা মনে আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে যে ভবিষ্যতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে, তাই সোনায় বিনিয়োগ করা ভাল।

পঞ্চমত, সোনার কোনও প্রকারের দায় বৃদ্ধি হয় না, এটি অত্যন্ত তরল, স্বর্ণ একটি রিজার্ভ সম্পত্তি এবং এটি একটি স্থিতির প্রতীক হিসাবে বিবেচিত হয়। এই কারণে ভারতে সর্বদা সোনার চাহিদা থাকে।

এছাড়া ভারতের বাজারে সোনার দাম অনেকাংশ আন্তজার্তিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল. কারণ ভারতে মোট প্রয়োজনের অধিকাংশ সোনা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ভারতীয় মুদ্রার বিনিময় মূল্য, কেন্দ্রীয় নানা কর এবং শুল্ক-সহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্ভর করে। 

মধ্যা কথা হল এই যে, ভারতে সোনার দাম বৃদ্ধির পিছনে  বাজারের সুদের হার হ্রাস,বাজারের বিভিন্ন জিনিসপত্রের দাম অনবরত হ্রাস-বৃদ্ধি  এবং শেয়ার বাজারে নিরাপত্তাহীনতা,ভারতীয় টাকার মূল্য ডলার পতি কমে যাওয়া, ভারত-চিন সীমান্তে উত্তেজনা প্রভৃতি এর  প্রধান কারণ হতে পারে বলে আন্তজার্তিক বিশ্লেষকদের মত.
অনেক স্বর্ণ বিশ্লেষকরা এখন তাদের দামের  লক্ষ্যগুলি সংশোধন করে বলেছেন যে আগামী দেড়-দুই বছরে প্রতি 10 গ্রাম সোনার  দাম প্রায় 65,000 টাকা পর্যন্ত যেতে পারে।


0 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *